সর্বশেষ লেখাগুলো

5:48 PM

শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথই নন নজরুলও তার গানে ব্যবহার করেছেন বিদেশী সুর

রবীন্দ্রনাথ তার বিভিন্ন গানে পাশ্চাত্য সুর ব্যবহার করেছিলেন। তাছাড়া আমাদের দেশের লোকগীতি ও লালনগীত সুরের প্রতিফলনও তার গানে দেখা যায়। নিন্দুকেরা এজন্য শুধু রবীন্দ্রনাথকেই কাঠগড়ায় দাড় করান। তবে রবীন্দ্রনাথই কিন্তু একমাত্র নন যিনি বিদেশী সুর তার গানে ব্যবহার করেছেন, আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামও তার গানে ইরানি, আরবি ও তুর্কি সুরের ব্যাপক ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে প্রথমেই বলা যেতে পারে তার বিখ্যাত নৃত্যসঙ্গীত ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’র কথা।

“শুকনো পাতার নূপুর পায়ে নাচিছে ঘূর্ণি বায়
জল তরঙ্গে ঝিলিমিলি ঢেউ তুলে সে যায়।“ (তুর্কি সুর)

এই গানটির সুর তিনি নিয়েছেন একটি প্রাচীন তুর্কি লোকগীতি থেকে। এই গানটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। আবার একই সুর ব্যবহৃত হয়েছে একটি আরবী গানে। নজরুলের গীতিগ্রন্থে দেখা যায় “শুকনো পাতার নূপুর পায়ে” গানটির শীর্ষে নজরুলের হস্তাক্ষরে লেখা আছে ‘আরবি সুর’। অর্থাৎ তিনি আরবী গানটি থেকে নিয়েছেন। কিন্তু গানটির রেকর্ডে আরবী বা তুর্কি সুর যাই হোক কোনটাই উল্লেখ করেননি। এই গানটির রেকর্ডে লেখা আছে ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’ সুর: কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী: হরিমতী, এইচএমভি রেকর্ড নং এন-৭১৭৩, প্রকাশকাল ১৯৩৩।

ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলরে দুনিয়ায়
আয়রে সাগর-আকাশ-বাতাস দেখবি যদি আয় (তুর্কি সুর)

এই গানটির সুরও তিনি নিয়েছেন একটি তুর্কি গান থেকে। এর রেকর্ডেও তিনি তুর্কি সুরের কথা উল্লেখ না করে নিজের নাম বসিয়ে দিয়েছেন। গানটির রেকর্ডে লেখা আছে ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলরে দুনিয়ায়’, সুর: কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী: আব্বাসউদ্দিন আহমদ, টুইন রেকর্ড নং এফটি-৩৯৮০, প্রকাশকাল: জুন ১৯৩৫।

তার আরো যেসকল গানের সুর বিদেশী গান থেকে নেয়া সেগুলো হল -
১। চমকে চমকে ধীর ভীরু পায় (আরবি সুর)
২। দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি (কিউবান দ্বীপের নৃত্যের সুর)
২। মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে নেচে যায় (মিসরের নাচের সুর)
৪। পরি জাফরানী ঘাঘরী চলে সিরাজের পরী (ইরানী সুর)
৫। মম তনুর ময়ূর সিংহাসন (ইরানী সুর)
৬। আনারকলি আনারকলি (ইরানী সুর)
৭। ইরানের বুলবুলি কি এলে (ইরানী সুর)
৮। ইরানের রূপমহলের (ইরানী সুর)
৯। ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি (হিজাজ ভৈরবী রাগ, ইরানের হিজাজ প্রদেশের সুর)
১০। নার্গিস সবাগমে বাহার কি আগমে (ইরানী সুর)
১১। বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে (নৌরচকা)

এছাড়াও ১৯৪২ সালে তার সঙ্গীত পরিচালনায় কলকাতায় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চৌরঙ্গী’ সিনেমায় তিনি দু’টি গানে আরবী সুর ব্যবহার করেছেন। গান দু’টি হল -
১। ‘রুম ঝুম ঝুম ঝুম রুম ঝুম ঝুম
খেজুর পাতার নূপুর বাজায়ে কে যায়’
২। জহরত পান্না হীরার বৃষ্টি
তব হাসি কান্না চোখের সৃষ্টি
তারও চেয়ে মিষ্টি মিষ্টি মিষ্টি

তাহলে দেখা যাচ্ছে নজরুলের অধিকাংশ জনপ্রিয় গানের সুরই হয় ইরানি নয়তো আরবি সুর হতে নেয়া; যেমনিভাবে রবীন্দ্রনাথ তার গানে ব্যবহার করেছেন ইউরোপীয়ান ও লালনের সুর। একজন শিল্পী ভিনদেশের সুরে অনুপ্রাণিত হতেই পারেন। এক্ষেত্রে দোষের কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুজনেই ভিনদেশী সুর তাদের গানে সার্থকভাবেই ব্যবহার করেছেন; সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের দেশজ সঙ্গীত। তাছাড়া মাত্র কয়েকটা গানে ভিনদেশী সুর ব্যবহার করার কারণে তো তাদের কৃতিত্ব খাটো হয়ে যায়নি। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের জাতীয় কবি নজরুল সবার কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য সন্মানটুকু পাবেন এটাই প্রত্যাশিত।

*** এই লেখার মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ২৩ শে মে ২০০৮ তারিখে দৈনিক যুগান্তরের নজরুল জন্মজয়ন্তী সংখ্যায় প্রকাশিত জনাব আসাদুল হক লেখাটি।

0 মন্তব্য: